ডোডো পাখিঃ ওরা মানুষকে বিশ্বাস করেছিল

ডোডো পাখিঃ ওরা মানুষকে বিশ্বাস করেছিল

July 11, 2018

[:bn]

সৌমেন নাথ, কৌশিক দাস

কয়েক হাজার বছর ধরে তিন রকমের, ভারী শরীরের, উড়তে  অক্ষম, ডোডো পাখির অস্তিত্ব ছিল এই পৃথিবীতে।

True Dodo: Raphus Cocullatus: মরিশাস দ্বীপ: নয় ইঞ্চি অর্থাৎ তেইশ সেন্টিমিটারের মতন লম্বা ঠোঁট, বিশাল মাথা, ছোট হলদে দুই পা, ভারী পায়ের পাতা, হলদে সাদা ছোট্ট ডানা, ছোট ঢেউ খেলা লেজের পালকগুলো, মুখের চামড়া আর গায়ের পালকের রং ছাই-এর।

ডোডো পাখিরা গাছ থেকে খসে পড়া ফল খেত। হয়তো গাছের বীচি বা শেকড়ও খেত।

বড় চেহারা, গায়ে পায়রাদের তুলনায় অনেক বেশি চর্বি, শক্ত পা নিয়ে জঙ্গলের ভেতর দিয়ে হাঁটত। যেহেতু শরীর বিশাল বড়, আর ডানাগুলি শরীরের তুলনায় বড় ছিল না, তাই ডোডো পাখি উড়তে পারত না।

বিশাল মাথা, বড় মুখগহবড়, বড় হাঁ, কাজেই বড় বড় ফল গিলে ফেলত, যখন গাছের প্রাচুর্য থাকত, তখন অনেক খেয়ে নিত। এরই ফলে খাদ্যের যখন অভাব হত, তখন না খেয়েও বেঁচে থাকত।

কিন্তু ডানা না থাকায় অতি বিপজ্জনক শত্রুর হাত থেকে এড়িয়ে পালানোর কোনো উপায় ডোডো পাখির ছিল না ।

তবে মানুষ আসার আগে মরিশাস- এ কোন ইঁদুর বা মাংসাশী প্রাণী ছিল না, যারা  ডোডো পাখির ক্ষতি করতে পারত। বড় কিছু সরীসৃপ অবশ্য ছিল, কিন্তু এরা তিরিশ পাউন্ড ওজনের ডোডো পাখির(বেঁকানো হাতুড়ির মতন ঠোঁট) শক্তির সমকক্ষ ছিল না।

উড়তে পারত না, তাই ডোডো পাখি জমিতেই ছিড়ে ঘাসের বাসা বুনত, নাসপাতির  সাইজের মাত্র একটা ডিম পারত।

অন্যান্য সমস্ত পাখিদের মতনই, গলার থলি (Crop)-র ভেতর গেলা পাথর,  খাবারকে গুঁড়ো করত। ফল ছাড়িয়ে খেত, ডোডো পাখির বেঁকানো ঠোঁটের সেই ক্ষমতা ছিল। জলে স্নান করত কিন্তু সাঁতার কাটতে পারত না।

বহুদিন আগে, মানুষেরই দ্বারা ডোডো পাখি পৃথিবী থেকে সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন হয়ে যায়।

১৫০৭ সালে পর্তুগিজ নাবিকরা প্রথম মরিশাসে আসে। ওই সময় পর্তুগিজরা সমুদ্রপথে সারা পৃথিবীতে অভিযান করেছিল। ১৫০৭ সালে ডোডো পাখিরা ওদের নজরে পড়ে।

Alfonso Albuquerqueএর নেতৃত্বে পর্তুগিজদের এঈ নাবিক দলটি সম্ভবত মরিশাস ছাড়া Reunion এবং Rodrigues-এ যায়। এই ভাবেই ইউরোপীয় নাবিকদের দ্বারা Mascatene Islands-এর আবিষ্কার, তবে ভারত মহাসাগরের চার পাশের দেশ থেকে আসা আরব নাবিকরা Mascatene islands- এর অস্তিত্ব জানতেন।

পর্তুগিজ নাবিক Albuquerque যখন Mascarene Islands-এ এলেন, তখন সেখানে কো্নো মানুষের বাসস্থান ছিল না

এরপর ১৫১২ সালে, আর একটি পর্তুগিজ  নাবিকদল  Pedro Mascarenhas-এর নেতৃত্বে এখানে এল। এরপর, ষোড়শ শতাব্দীতে পর্তুগিজরা মরিশাস দ্বীপ সম্বন্ধে কোনো আগ্রহ দেখায়নি।

ডোডো পাখি হয়তো পর্তুগিজরা দেখেছিল, কিন্তু তারা ডোডো পাখি নিয়ে আগ্রহ দেখায়নি।

এরপর ডাচদের কথা।

ডাচ নাবিকরা ছিল নৃশংস, এরাই ডোডো পাখির হত্যাকারী।

Jacob Cornelius Van Neck- এর নেতৃত্বে ডাচ নাবিকদল ১৫৯৮ সালে মরিশাসে আসে। এরা কচ্ছপ এবং ডোডো পাখিদের নিজেদের খাদ্য হিসেবে শিকার করতে শুরু করে।

১৬০১ সালে Van Neck- এর বর্ণনা হল্যান্ডে প্রকাশিত হয়। ১৬০১ সালে প্রকাশিত Van Neck- এর লেখায় ডোডো পাখির উল্লেখ দেখা যায়;Van Neck- এর বর্ননা- ”হাঁসের চেয়ে অনেক বড়, বিশাল মাথা, তার ওপর চাদরের মতন চামড়া, ওই পাখিগুলোর ডানা নেই, ডানার জায়গায় শুধু তিন-চারটে কালো পালক, লেজ আছে, ধূসর রঙের লেজ, এদের মাংস বেশি ফোটালে অখাদ্য হয়ে যায়। তাই এই পাখিগুলোকে আমরা Walck Vogel বলছি।”

খুব সম্ভবত Jacob Cornelius Van Neck- এর এই বর্ণনায় ডোডো পাখি সম্বন্ধে কোন ইউরোপিয়ানের  প্রথম রিপোর্ট। কিন্তু অসহায় ডোডো পাখিদের প্রসঙ্গে নৃশংস ডাচদের অভিমত এখানেই প্রকাশিত: Walck Vogel: ডাচ ভাষায় এর ইংরেজি প্রতিশব্দ হল Disgusting Bird.

পরে পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়া ডোডো পাখি সম্বন্ধে ব্যবহৃত অন্যান্য ডাচ শব্দগুলি হল Walgh Vogel,Walg vogel, Waldt vogel,Waligh vogel এবংWaly vogel. ডাচদের মন্তব্য, ”অনেকক্ষণ ধরে ফোটালে ও মাংস নরম হয় না, শুধু বুক আর পেট খেতে খুব ভালো।”

Van Neck-এর এই অভিযানের কিছুদিন বাদে আরও একটি ডাচ জাহাজ মরিশাসে এল। এই ডাচ জাহাজটির নৃশংস ডোডো পাখি নিধনের বর্ণনা জাহাজটির ক্যাপ্টেনের বিবৃতিতে প্রকাশিতঃ ”আমরা অনেকে জাহাজ থেকে জমিতে গিয়ে মোটাসোটা অনেকগুলো ডোডো পাখি ধরে নিয়ে এলুম,এদের তিন-চারটিকে মেরে চমৎকার ভোজ খেলু্ম, বাকি-গুলোকে পড়ে খেলুম। দশদিন বাদে আবার ২৪ টা ডোডো ধরে আনলুম।” ওই ক্যাপ্টেন আরও বলেছেন, ”পাঁচদিন বাদে জাহাজ থেকে আরো ৫জন, লাঠ্‌ জাল, শিকারের জিনিস নিয়ে,৫০ টা পাখি মেরে আনলাম, এর মধ্যে ২০ টা ডোডো। কচ্ছপের মতনই ডোডো ধরা অতি সোজা।” ওই ডাচ ক্যাপ্টেন ঊড়তে ব্যর্থ ডোডো পাখিদের তিন রকম নাম দিয়েছেন: Dronten, Doda Arsen,Wallich Vogel. কিন্তু ডাচ ভাষায় Dronten শব্দের অস্তিত্ব নেই। খুব সম্ভবত Dronten শব্দটি ডাচ Verb-এর অপ্রচলিত প্রতিশব্দঃ ইংরেজিতে To Be Swollen. ওই Doda Arsen শব্দটি অর্থ : Dod শব্দটি ডাচ ভাষায় ইংরেজি প্রতিশব্দ Round Heavy Lump আর Arsen ইংরেজিতে Arse=Round Ass=Fat Ass: অর্থাৎ সব শব্দগুলো মেলালে দাঁড়ায় Swollen Lump Assed Bird: হতভাগ্য ডোডো পাখিদের বর্ণনায় ডাচদের কী নির্মম বিদ্রূপ। । ।

আবার অন্য ভাষাতত্ত্ববিদদের মতে, Doda Arsen, ডাচ শব্দ Dodoor-র থেকে নেওয়া। এর অর্থ Sluggard (অলস), অবশেষে Doddar থেকে ডাচ নাবিকদের মুখে-মুখে Doddars আর Dodars থেকে হতভাগ্য পাখিগুলির সংক্ষিপ্ত ডাচ নামকরণ Dodo। Dodo মানে অলস, ধীরগতির পাখি।

তৃতীয় মতটি পাচ্ছি ইংরেজি পর্যটক Thomas Herbert-এর লেখা থেকে। ইনি বলেছেন, পাকস্থলিটা খুব ভালো খেতে, আর ডোডো শব্দটা এসেছে পর্তুগিজ শব্দ Doudo থেকে, এর মানে হলো বোকা বা সাধারণ।Thomas Herbert -ই সালে প্রথম Dodo শব্দটি লিখিতভাবে পুস্তক আকারে প্রকাশ করেন।

Erol Fuller(1988):Extinct Birds (New York) Facts Of File বইটিতে কিন্তু Fuller সাহেব ভিন্নমত প্রকাশ করেছেন Fuller- এর মতে ডোডো নামটি(Dodo) পাখিগুলির ডাকের নকল: পায়রার মতন দুই অক্ষরের Doo Doo.

ডাচ নাবিকদের বিদ্রুপগুলি অসহায় পাখিগুলির দিকে নির্দেশিত: বোকা, ফোলা, আস্তে  হাঁটা, মোটা ঠোঁট।

ইউরোপীয়দের বিদ্রূপের উত্তরে অসহায় ডোডো পাখির পক্ষ থেকে মন্তব্য করা যায়; ডোডো পাখি বোকা অলস, কেননা মরিশাস দ্বীপে মানুষ আসার আগে ওদের কোনো শত্রু ছিল না। এরই সমর্থন পাচ্ছি একজন ডাচ নাবিকের১৬৩১ সালের মন্তব্যঃ ”পাখিগুলি রাজসিক বন্ধুভাবে আমাদের দিকে হেঁটে এল, কালো মু্‌খ, খোলা ঠোঁট, আমাদের চলার রাস্তাতেই দাঁড়িয়ে রইল, আমাদের কাছ থেকে সরে গেল না।”

মরিশাস দ্বীপে শুধু বোকা ডোডো পাখি কেন, অন্যান্য পাখিরা, যারা উড়তে পারত, তারা ও বিশ্বাস করেছিল নিষ্ঠুর মানুষগুলোকে বন্ধু হিসেবে। যেমন Van Neck (১৫৯৮ সালে) উড়তে প্রচন্ড সক্ষম Turtle Dove সম্বন্ধে লিখেছেন:”আমাদের দেখেও Turtle Dove পাখিগুলো তাদের জায়গা থেকে উড়ে যায়নি। ফলে অগুন্তি পাখি আমাদের তাদের মারার সুযোগ করে দিয়েছl

১৬০৭ সালে আরও একটি ডাচ অভিযানের একটি নিষ্ঠুর রিপোর্তঃ”অজস্র কচ্ছোপ, ডোডো, পায়রা, Turtle Dove,Grey Parrot আমরা জঙ্গলে গিয়ে হাত দিয়ে ধরে ফেলেছিলুম, ওই পাখিগুলো বা কচ্ছোপগুলো পালাবার চেষ্টা করেনি। মানুষদের বন্ধু বলে মনে করেছিল।

১৬১১ সালে আরও একজন ডাচ অভিযানের লেখকের মরিশাস অভিযানের খুশির বর্ণনা:” এত সহজে ওদের মারার কি আনন্দ!!!”

ডোডো প্রসঙ্গে ইনি লিখেছেনঃ”ধূসর রং, সংখ্যায় অগুন্তি, অজস্র, ডাচরা প্রতিদিন অজস্র ধরতেন, অনেকগুলি খেতেন।” ” শুধু ডোডো কেন এখানকার সব পাখিগুলিই এত শান্ত, পোষমানা যে আমরা শুধু ছড়ি দি ছরি দিয়েই অনেক বুনো পায়রা আর টিয়া মেরেছিলাম, অথবা খালি হাতেই ধরেছিলাম। হ্যাঁ, ডোডো পাখি ধরার সময় সাবধান হতাম,কারণ ওদের ঠোঁট ভীষণ শক্ত, কামড়াতে যাতে না পারে।”

Erol Fuller সাহেব তাঁর Extinct Bird (1988) বইটিতে লিখেছেন, অল্প সময়ের মধ্যেই ইউরোপীয়রা নিষ্ঠুরভাবে অগুন্তি ডোডো পাখি মেরে ফেলল ভারত মহাসাগরের অভিযানে। কারণ, এদের মাংস।

ডোডোদের ওপর মানুষের হিংস্রতা চলল দশকের পর দশক ধরে, ডোডো পাখি একেবারে মাত্র একটাই ডিম পাড়ত, অতএব পাখিগুলোর সংখ্যা কমতেই লাগল।

 সমুদ্র অভিযানের সময় পর্তুগিজরা মরিশাস দ্বীপে শুয়োর এনেছিল। আর, এরপর কয়েক দশকের মধ্যেই মরিশাস দ্বীপ, ইউরোপীয়দের আনা বাঁদরে, ছাগলে,  বেড়ালে ভর্তি হয়ে গেল।

এই শুয়োর আর বাঁদরগুলো ডোডো পাখির অস্তিত্ব আরও বিপন্ন করে তুলল। পর্তুগিজরা, ডাচরা এই প্রাণীগুলোকে মরিশাস দ্বীপে এনেছিল।

ছাগলগুলো হল ডোডো পাখিদের খাবারের প্রতিদ্বন্দ্বী। বেড়ালগুলো ডোডোদের শত্রু; তবে শুয়োর, বাঁদর হয়ে গেল ডোডোদের ডিম এবং বাচ্চাদের প্রাণহরণকারী শত্রু।

ডোডোদের এই শত্রুদের সংখ্যা, এদের বিপুল প্রজননের ফলে বিদ্যুৎগতিতে বাড়তে লাগল।

আর, বাঁদর আর শুয়োর তো সর্বভুক (Omnivorous)। কাজেই

ষোড়শ শতাব্দীর শেষদিকে এক রিপোর্টে দেখা যায়, মরিশাসের সামুদ্রিক কচ্ছপ তথা দ্বীপের সমস্ত অসহায় কচ্ছপের অবলুপ্তি: শুয়োর আর বাঁদরগুলো সমস্ত কচ্ছপের ডিম খেয়ে নিয়েছিল।

মানুষের আনা বুনো হিংস্র শুয়োরগুলোর বংশবৃদ্ধি হত অসম্ভব দ্রুতগতিতে (Feral Pigs)। ১৭০৯   সালের একটি রিপোর্টে জানা যায় যে মাত্র ৮০ জনের একটি দল একদিনে কয়েক হাজার বুনো শুয়োর মেরেছিল মরিশাস দ্বীপে। কিন্তু ততদিনে ডোডো পাখিরা (True Dodo)মরিশাস দ্বীপ থেকে সম্পূর্ণ নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছে।

আর বাঁদরদের কথাঃ মানুষের আনা, মরিশাস দ্বীপের হিংস্র বাঁদরগুলো ছিল Macaca Fascicularis গোত্রের কাঁকড়া খাওয়া বাঁদর। এই চরম হিংস্র বাঁদর আগে থাকত উত্তরাংশ থেকে ইন্দোচিন, মালয়েশিয়া, ফিলিপাইন-এ। আচ্ছা, এই Macaca Fascicularis বাঁদরগুলো নিশ্চয়ই আকাশে  উড়তে, অথবা সমুদ্রে সাঁতরাতে পারত না। তাহলে ডোডোদের শত্রু এই হিংস্র বাঁদরগুলো মরিশাস দ্বীপে এলো কীভাবে?

ডাচদের মতে : এই হিংস্র বাঁদরগুলোকে হয়তো ষোড়শ শতকের পর্তুগিজরাই মরিশাস দ্বীপে এনেছিল। কারণ পর্তুগিজ নাবিকরা বাঁদরের মাংস খেতে ভালবাসত।

তবে ডাচদাচ দেওয়া এই তথ্য, অর্থাৎ পর্তুগিজরা মরিশাসে বাঁদর এনেছিল, এ কথাটা কতটা বিশ্বাসযোগ্য?

কারণ Mascaranes-এ যাওয়ার ক্ষেত্রে Reunion দ্বীপকে পর্তুগিজরা মরিশাসের চেয়ে বেশি পছন্দ করেছিল। আর Reunion দ্বীপে কোনোদিনই কোনো কাঁকড়া খাওয়া হিংস্র বাঁদর ছিল না।

কাজেই মরিশাস দ্বীপে ওই বাঁদর আনার কাজটা  করেছিলেন ডাচরাই, পর্তুগিজরা নয়, কারণ ডোডো নিধনকারী ওই হিংস্র Macaca Fascicularis ( এখন জানা যায়) তৎকালীন অস্তিত্ব ছিল জাভা দ্বীপে, আর জাভা দ্বীপে ১৫৯৬ সাল থেকেই ডাচরা গিয়েছিলেন।

যিনি ১৭০৯ সালে আশি জন মানুষের দ্বারা কয়েক হাজার বুনো শুয়োর মারার কথা  লিখেছেন, তিনি আরও লিখেছেন যে মরিশাস দ্বীপের একটি বাগানে তাঁরা অন্তত চার হাজারMacaca Fascicularis  হিংস্র বাঁদর দেখেছিলেন। চারহাজার শব্দটি তিনি হয়তো বাড়িয়ে বলেছিলেন, কিন্তু এটা ঠিক যে উড়তে অক্ষম, মাত্র একেবারে একটা ডিম পাড়া (তাও মাটিতে) অসহায় ডোডো পাখিদের জীবন দুঃসহ করে দিয়েছিল সর্বভুক শুয়োর আর বাঁদরেরা।

ডোডো পাখিদের নিশ্চিহ্ন হওয়ার একটি বিশ্বাসযোগ্য বর্ণনা পাওয়া যায় ১৬৬২ সালে:

Volquard Iversen নামে একজন ডাচ জাহাজডুবির ফলে মরিশাস দ্বীপে দলবল নিয়ে সাঁতরে ওঠেন। মরিশাস দ্বীপে সাঁতরে ওঠার পর Iversen আর তাঁর সঙ্গীরা খাদ্য খোঁজেন।

ওরা মরিশাস দ্বীপে কোনো ডোডো পাখি পেলেন না। কিন্তু কাছেই একটি ছোট্ট দ্বীপে কতগুলি ডোডো পাখি ওঁদের নজরে এল। প্রকৃতির খেলায়, মরিশাস দ্বীপ থেকে জলস্রোতে সাময়িক আলাদা হয়ে যাওয়া এই ছোট্ট দ্বীপটিতে মাত্র শেষ কয়েকটি ডোডো পাখি মানুষ, শুয়োর আর বাঁদরের আক্রমণ থেকে পালিয়ে বেঁচেছিল।

এরপর আর কি, ভাটার সময় জল সরে যেতেই Iversen আর তাঁর সঙ্গীরা জলের মধ্য দিয়ে হেঁটে গিয়ে একটা ডোডো পাখির পা মুচড়ে ধরলেন, পাখিটা যন্ত্রণায় কেঁদে উঠল, অন্য ডোডো পাখি-গুলো না পালিয়ে বোকার মতো তাদের সঙ্গী পাখিটাকে

বাঁচাতে এগিয়ে এল। Iversen আর তাঁর সঙ্গীরা, মানুষকে বন্ধু ভাবা, ওই পাখিগুলোকে ছুরি আর লাঠির সাহায্যের শেষ করলেন।

এইভাবেই Iversen -এর কবলে পড়ে মরিশাস দ্বীপের শেষ ডোডো পাখির দলটি নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল।      আর Iversen-দের ভাগ্যও ভালঅ। মাত্র ৫ দিনের মধ্যে ওখান দিয়ে যাওয়া একটি জাহাজ Iversen- দের উদ্ধার করে নিয়ে গেল।

মরিশাস দ্বীপে মাত্র একটি স্ত্রী ডোডো পাখি Iversen এর আক্রমন থেকে ১৬৬২ সালে বেঁচে গিয়েছিল। এই স্ত্রী ডোডো পাখিটিই ছিল বোকা ডোডো পাখিদের মধ্যে বুদ্ধিমতী বা ভাগ্যবতী ।

ওর স্বামীর মাথা ওর চোখের সামনে Iversen-দের  লাঠির আঘাতে গুঁড়িয়ে গিয়েছিল ।সম্ভবত ওর বাচ্চাটা শুয়োরের ভক্ষ্য হয়েছিল আর ওদের ডিম হয়তো বাদরে খেয়ে নিয়েছিল ।

প্রায় ৬ বছর ধরে এই হতভাগিনী বুদ্ধিমতী ডোডো পাখিটি পালিয়ে বেঁচেছিল খুব সম্ভব দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্তে, যেখানে মানুষ পৌঁছতে পারেনি। অথবা black river gorges-এ বেচারি পালিয়ে বেঁচেছিল।

সমস্ত ডোডো পাখি নিহত । প্রায় ৬ বছর ধরে ও আর একটা পুরুষসঙ্গী খুঁজছিল। কিন্তু ও কোন  পুরুষসঙ্গী পায়নি । ৩০ বছর বা ৩৫ বছর আবধি বেঁচেছিল,শেষে ও সম্পূর্ণ অন্ধ হয়ে যায় ।

১৬৬৭ সালে একদিন ভোরবেলা প্রবল বৃষ্টি আর ঝড়ের থেকে বাঁচতে ও একটা পাহাড়ের পাথরের নিচে আশ্রয় নেয় । ও কি বুঝতে পেরেছিল,ওই পৃথিবীর শেষ জীবিত ডোডো পাখি ?

বৃষ্টি আর ঝড়ের শেষে ,অন্ধ পাখিটার মৃতদেহ পড়ে রইল ওই পাথরেরই নীচে । ওরই  মৃতদেহ,পরবর্তীকালে মানুষের পাওয়া, পৃথিবীর সর্বশেষ Raphus Cucullatus ডোডো পাখির মৃতদেহ।।।

 তিন রকমের ডোডো পাখি

মরিশাসের Raphus Cucullatus  ডোডো পাখি ছাড়া আরও দু’ ধরনের ডোডো পাখি ছিল:  Reunion-এর  Reunion Solitaire আর Rodrigues-এর   Rodrigues Solitaire.

আজ ডোডো পাখির অস্তিত্ব বিভিন্ন মিউজিয়ামে, তাও ওদের শরীরের মাত্র কয়েকটি অংশই পাওয়া গিয়েছে:

ব্রিটিশ মিউজিয়াম: একটা পা

অক্সফোর্ড: একটা মাথা আর পায়া

আর কোপেনহ্যাগেন মিউজিয়াম: ডোডো পাখির একটা মাথা।

১) Rodrigues Solitaire, ২) Reunion Solitaire   ৩) True Dodo অর্থে Raphus Cucullatus:এই তিন ধরনের ডোডো পাখির মধ্যে Rodrigues Solitaire অন্যান্য দুইরকম ডোডো পাখির চেয়ে কিছুটা কম শক্তিশালী ছিল।Rodrigues Solitaire -র মাথা অন্যান্য  দুইরকম ডোডো পাখিদের চেয়ে কিছুটা ছোট ছিল, ঠোঁটটা কিছুটা কম লম্বা, ঠোঁটের অগ্রভাগ ছিল একটু বেঁকানো। অধিকাংশ Rodrigues Solitaire-র  রং ছিল বাদামি, তবে সাদা রংও হত। ঠোঁটের অগ্রভাগে একটা স্ফীত আব (Knob) থাকত, এটা মারামারির সময় কাজে লাগত। তবে, শত্রুদের সঙ্গে লড়ে ওরা টিকে থাকতে পারেনি। Rodrigues Solitaire অন্যান্য দুরকম ডোডো পাখির চেয়ে অনেক জোরে ছুটতে পারত, তাই হয়তো ওরা ১৭৯০ সাল অবধি পৃথিবীতে টিকে থাকতে পেরেছিল।

আর একরকম ডোডো পাখিঃ Reunion Solitaire হত সাদা রঙের, লেজে থাকত কয়েকটা হলুদ পালক। এদের অবলুপ্তি ১৭৪৬ সালে।

আর True Dodo অর্থে Raphus Cucullatus-এর পরিণতি তো আগেই লিখেছি। Volquard Iversen- দের হাতে একটি পাখি ছাড়া সমস্ত Raphus Cucullatus ডোডো পাখির অবলুপ্তি হয় ১৬৬২ সালে। মাত্র পাঁচ দিন পরে, Volquard Iversen তাদের উদ্ধারকারী জাহাজ দেখতে পাওয়ার পর প্রসঙ্গে সেই মর্মস্পর্শী কবিতাটি লেখেন: Volquard Iversen-এর উল্লাসের কবিতা: ওদের প্রতি মানুষের নির্মমতার কবিতা :

And I ate that cook in

 week or less

And as I eating be

The last of his crops, why,

I almost drops

When a vessel in sight I see.

১৬৬৭ সালে শেষ অন্ধ Raphus Cucullatus স্ত্রী পাখিটি শীতে- বৃষ্টিতে কাঁপতে কাঁপতে  ওর মাথাটি শরীরের ভেতর (ছোট দানার ভেতর) ঢুকিয়ে নিয়েছিল। সমস্ত শরীরের পালক ছড়িয়ে শীত থেকে বাঁচতে চেয়েছিল। কিন্তু ও ছিল সেদিন প্রকৃতির কাছে একেবারেই অসহায়।

ওই অবস্থায় ওর মৃতদেহ আবিষ্কৃত হয় একটা নদীর ওপরে , দুর্গম পাহাড়ের পাথরের খাঁজের মধ্যে । বেচারা , শেষ অন্ধ Raphus Cucullatus ডোডো পাখিটা !!! আর ওকে যাঁরা খুঁজে পেয়েছিলেন, তাঁরা তখন খাদ্যসন্ধানে জীবিত ডোডো পাখি খুঁজে বেড়াচ্ছেন, কিন্তু না ; আর জীবিত কোন Raphus Cucullatus  ডোডো পাখি মরিশাস দ্বীপে ওঁরা খাদ্য হিসেবে পেলন না ।

[:]

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Latest Blog

  • বাই বাই একাকিত্ব

    April 1, 2019 Read more
  • সহস্র হ্রদের দেশঃ ফিনল্যান্ড

    March 28, 2019 Read more
  • পথের পাঁচালি ও ভাগলপুরের বাঙালি সমাজ

    March 28, 2019 Read more
View All

Contact Us

(033) 23504294

orders@devsahityakutir.com

21, Jhamapukur Lane, Kolkata - 700 009.

Book Shop

View All